মাস্কাট, ১৬ মে – প্রবাসের মাটিতে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমানো চার-চারটি তরতাজা ভাই একসাথে লাশ হয়ে ফিরছেন দেশে। ওমানের বারকা এলাকায় চলন্ত গাড়ির ভেতরে ‘সাইলেন্ট কিলার’ খ্যাত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে দম আটকে চিরতরে ঘুমিয়ে গেছেন তাঁরা। কিন্তু যে মা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটা ছেলেদের ফেরার পথ চেয়ে আছেন, তিনি এখনো জানেন না তাঁর চার রত্ন আর এই পৃথিবীতে নেই। হৃদয়বিদারক এই ট্র্যাজেডি এখন ওমান ও বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোকের ঝড় তুলেছে।
মৃত্যুর ঠিক আগে ভয়েস মেসেজ: “গাড়ি থেকে বের হওয়ার ক্ষমতাও নেই!”
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর বন্দরাজপাড়ার বাসিন্দা চার ভাই—রাশেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম। গত বুধবার ওমানের বারকা এলাকা থেকে মুলাদ্দাহর উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তাঁরা।
রাত ৮টার পর হঠাৎ করেই এক আত্মীয়ের ফোনে আসে একটি শিউরে ওঠার মতো ভয়েস মেসেজ। গাড়ির ভেতর থেকে অত্যন্ত দুর্বল কণ্ঠে চার ভাইয়ের একজন বলেন, “আমাদের নাকে-মুখে ফেনা চলে আসছে। গাড়ি থেকে বের হওয়ার মতো অবস্থা আমাদের নেই।” মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে মায়ের ফোনে কল করে শুধু বলেছিলেন, “মা, আমাদের জন্য দোয়া করো।”
এরপর ওমানের একটি ক্লিনিকের সামনে পার্ক করা গাড়ির ভেতর চারজনকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন স্থানীয়রা। রয়্যাল ওমান পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাড়ির লক খুলে চার ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করে।
ওমান পুলিশের চাঞ্চল্যকর তথ্য: যেভাবে প্রাণ কাড়ল “এসি”
কীভাবে মাত্র কয়েক মিনিটে চারজন সুস্থ মানুষের মৃত্যু হলো, তা নিয়ে ওমান পুলিশ দীর্ঘ তদন্ত শেষে এক ভয়ঙ্কর সত্য সামনে এনেছে। টাইমস অব ওমান-এর বরাত দিয়ে জানা গেছে, গাড়িটি চালু থাকা অবস্থায় এর এসির এগজস্ট (Exhaust) থেকে মারাত্মক বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস নির্গত হচ্ছিল।
বদ্ধ গাড়ির ভেতরে এই বর্ণহীন ও গন্ধহীন গ্যাস ছড়িয়ে পড়ায় চার ভাই ধীরে ধীরে অচেতন হয়ে পড়েন এবং তীব্র শ্বাসকষ্টে মারা যান। এই ঘটনার পর ওমান পুলিশ সবাইকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছে—কখনো লক করা বা আবদ্ধ গাড়ির ভেতর এসি চালিয়ে ঘুমাবেন না বা দীর্ঘ সময় বসে থাকবেন না।
মায়ের জন্য এখনো ‘অসুস্থ’ ছেলেরা: ফটকে তালা ঝুলিয়ে সত্য লুকাচ্ছেন ভাই!
এদিকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় চার ভাইয়ের বাড়িতে এখন এক অদ্ভুত ও থমথমে নীরবতা। তিন দিন পার হয়ে গেলেও বৃদ্ধা মা খাদিজা বেগমকে এখনো জানানো হয়নি তাঁর চার ছেলের মৃত্যুর খবর। তিনি শুধু জানেন, ছেলেরা গুরুতর অসুস্থ হয়ে ওমানের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
মায়ের শারীরিক অবস্থা এতটাই আশঙ্কাজনক যে, চার ছেলের মৃত্যুর খবর শুনলে তিনি স্ট্রোক করতে পারেন। তাই পাড়া-প্রতিবেশী বা কোনো আত্মীয় যেন ভুল করেও মায়ের কানে এই খবর দিতে না পারেন, সে জন্য বাড়ির প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে রেখেছেন বেঁচে থাকা একমাত্র ভাই মোহাম্মদ এনাম (৩২)। মায়ের পাশে বসে এনাম নিজের চোখের জল আড়াল করে সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছেন, অথচ বাইরে চলছে লাশ দাফনের প্রস্তুতি।
মঙ্গলবার বিকেলে পৌঁছাবে লাশ: পাশাপাশি খোঁড়া হয়েছে ৪টি কবর
শনিবার (১৬ মে) দুপুরে নিহতদের স্বজনেরা নিশ্চিত করেছেন যে, আগামী মঙ্গলবার (১৯ মে) বিকেলে ওমান থেকে বাংলাদেশগামী একটি বিশেষ ফ্লাইটে চার ভাইয়ের লাশ একসঙ্গে দেশে পৌঁছাবে। বাংলাদেশ দূতাবাস ও চট্টগ্রাম সমিতি ওমানের নেতারা লাশ দেশে আনার প্রক্রিয়া প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পন্ন করেছেন।
চট্টগ্রাম সমিতি ওমানের সভাপতি মোহাম্মদ ইয়াসিন চৌধুরী জানিয়েছেন, যেহেতু এটি কোনো সড়ক দুর্ঘটনা নয়, তাই ওমান সরকার এর ব্যয়ভার বহন করবে না। সম্পূর্ণ খরচ নিহতদের পরিবার এবং সমিতি মিলে বহন করছে। ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী চার ভাইয়ের লাশ দাফনের জন্য গ্রামের কবরস্থানে ইতিমধ্যেই পাশাপাশি চারটি কবর নির্ধারণ করা হয়েছে।
দরিদ্র এই পরিবারটি প্রবাসী ভাইদের পাঠানো টাকায় মাত্র কিছুটা সচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেছিল, কিন্তু একটি যান্ত্রিক ত্রুটি আর বিষাক্ত গ্যাস এক নিমেষেই ওলটপালট করে দিল একটি পুরো পরিবারকে।